স্কুল ব্যাগটি দাও, না হয় শ্রমিকের অধিকার দাও  

মহিউদ্দিন আল মাহিঃ 

যে বয়সে শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল বই আর পেন্সিল, সেই বয়সেই নিজের আহার জোগানোর জন্য কাজের সন্ধানে নামতে বাধ্য করছে তাঁর জীবন। এক শ্রেণীর লোভী স্বার্থ পিপাসু মানুষ এই সকল শিশুর দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে ভোগ করছে সুবিধা। কেননা এ সকল শিশুদের শ্রমের মূল্য খুবই নগন্য। বাংলাদেশে যে সকল সেক্টরে শিশু শ্রমের প্রবনতা বেশি দেখা যায় তার মধ্যে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস, প্রিন্ট, খাবার হোটেল, লেগুনার হেল্পার, এমব্রয়ডারি, পোশাক, চামড়া শিল্প, জুতা এবং ইট কারখানা অন্যতম।

যে বয়সে তাঁদের দায়িত্ব পরিবারের নেয়ার কথা ছিল উল্টো তারাই আজকে পরিবারের প্রধান কর্তার দায়িত্ব নিয়েছে। যার ফলে বয়স গোপন করে অনেক শিশু গার্মেন্টসে কাজ করছে নিজের পরিবার চালানোর জন্য। মার্কিন শ্রম বিভাগের প্রতিবেদন অনুসারে শিশু শ্রম ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে ভারত এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে ফিলিপাইন।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এবং বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আঠারো (১৮) বছরের কম বয়সী সকল বাংলাদেশী ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে এবং চৌদ্দ (১৪) থেকে আঠারো (১৮) বছরের কম বয়সী শিশুদেরকে কিশোর/কিশোরী হিসেবে গন্য করা হয়। স্কুল চলাকালীন সময় চৌদ্দ (১৪) বছরের নিচে কোন শিশুকে তার পরিবারের লিখিত অনুমতি ছাড়া উৎপাদনশীল কাজে নিয়োগ দেওয়া বা কাজ করিয়ে নেয়াকে শিশুশ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথবা শিশু শ্রম বলতে শিশুদের শ্রমের সময় প্রত্যক্ষভাবে উৎপাদন কাজে এবং পরোক্ষভাবে গার্হস্থ্য শ্রমে ব্যয় করাকে বোঝায়। এর জন্য সারা পৃথিবীতে ১২ই জুন বিশ্ব শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

শিশু অধিকার সনদের মূলনীতিতে উল্লেখ আছে, বৈষম্যহীনতা, শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা,শিশুর অধিকার সমুন্নত রাখতে পিতা মাতার দায়িত্ব, শিশুদের মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এই প্রচলিত আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম বয়সে কাজে নিয়োজিত সকল শ্রমিকই শিশু শ্রমিক। বিশেষজ্ঞদের ঐক্যমত্য অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক সকল ক্ষেত্রে শিশুর জন্য শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক দিক থেকে ক্ষতিকর এবং শিশুর প্রয়োজন ও অধিকারের সঙ্গে সামজ্ঞস্যহীন বঞ্চনামূলক শ্রমই শিশু শ্রম।

পোশাক শিল্প কারখানা একটি শ্রম নির্ভর শিল্প। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় লিড টাইম ব্যবস্থাপনার জন্য কারখানায় প্রচণ্ড কাজের চাপ থাকে। ফলে এ শিল্পে শিশু শ্রমিক নিয়োগ শিশুর মানসিক বিকাশ সহায়ক হবে না বলে কর্তৃপক্ষ মনে করেন যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল শিশুর জন্য প্রযোজ্য। এ জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে মানব সম্পদ বিভাগের অফিসারগণ চাকুরীর জন্য আগত প্রার্থীদের জাতীয় পরিচয় পত্র এবং জন্ম নিবন্ধনের মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে থাকেন।

বাছাই এর পরও প্রার্থির বয়স নির্ধারনের বিষয়টি অধিকতর নিশ্চিত হওয়ার জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসক এর মাধ্যমে নিয়োগ প্রার্থীর বয়স নির্ধারণ করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ প্রার্থীর বয়স প্রমাণের জন্য পরীক্ষা পাশের সনদ পত্র গ্রহণ করেন।

যদি কখনো অত্র প্রতিষ্ঠানে শিশু ও কিশোর শ্রমিক আছে বলে প্রমাণিত হয় তাহলে নিম্নে উল্লেখ্য শ্রম আইন অনুযায়ী সকল নিয়মনীতি অনুসরণে কর্তৃপক্ষ অঙ্গীকার বদ্ধঃ-

কোন কিশোর শ্রমিককে দিয়ে দৈনিক পাচঁ ঘন্টা সপ্তাহে ত্রিশ ঘন্টার অধিক কাজ করানো যাবে না।

কোন কিশোর শ্রমিককে দিয়ে দৈনিক অতিরিক্ত দুই ঘন্টা সহ মোট ৭ ঘন্টা এবং সপ্তাহে ৪২ ঘন্টার বেশি কাজ করানো যাবে না।

কোন কিশোর শ্রমিককে দিয়ে সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে কোন কাজ করানো যাবে না।

কিশোর শ্রমিকের কাজের সময় দুইটি শিফটে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, এবং কোন শিফটের সময় সীমা সাড়ে সাত ঘন্টার বেশি হবে না।

কোন কিশোর শ্রমিক একই দিনে একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবে না।

কোন কিশোর শ্রমিককে দিয়ে ভূগর্ভে অথবা পানির নীচে কাজ করানো যাবেনা।

বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতি কিশোর কর্ম ঘন্টা সম্পর্কে তার কাজের নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ পূর্বক একটি নোটিশ প্রদর্শন করতে হবে।

বিধিতে যা কিছুই থাকুক না কেন তাদের স্বাস্থ্য উন্নতি এবং শিক্ষা গ্রহনে বাধা এমন কোন কাজ দেয়া যাবে না।

যদি কোন কিশোর শ্রমিক বিদ্যালয়গামী হয় তা হলে তার কাজের সময় এমনভাবে নির্ধারন করতে হবে যাতে তার বিদ্যালয় গমনে বিঘ্নিত না হয়।

একটি শিশু শ্রমিক দ্বারা ভারি কাজ করালে শিশুরা পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারার সম্ভবনা থাকে। বেশি ঝুকিপূর্ণ বা বিপজ্জনক কাজে শিশুর মানুষিক বিকৃতি দেখা দিতে পারে ভবিষ্যতে। শিশুদের পারিশ্রমিক কম থাকায় কাজের প্রতি অমনোযোগী হতে পারে ভবিষ্যতে।

কিশোর শ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এই অধ্যায়ের সকল বিধান যতদুর সম্ভব, উক্ত শিশু শ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইবে।

শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে শিশুদের উন্নয়নের সার্বিক কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। কিন্তু আজকে দেশের প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের সাথে একই কর্মে লিপ্ত দেখা যায় শিশুদের। তাই আজ পৃথিবীতে শিশু দিবসের কি দরকার আছে? আজ শ্রমিক দিবসে তাঁদের শ্রমিক বলে সম্মান দিলেই বরং তাঁদের মনের কষ্টটা অন্তত একটু হলেও সান্তনা খুঁজে পেয়ে শিশুটির নিজের কাছে ভালো লাগবে। নিজেকে অন্তত আর শিশু ভেবে স্কুল ব্যাগটি পিঠে নেয়ার কথা মনে করে কষ্ট পেতে হবে না। নিজেকে একজন শ্রমিক ভেবে কর্মের বোঝাকে পিঠে বইতে হয়তবা চোখের কোনে আর জল আসবেনা। বর্হিবিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য দেশের শিশু শ্রমিকদের কর্মের বোঝা সরিয়ে পিঠের উপর স্কুল ব্যাগ তুলে দিতে কি পারবে কেউ?

কমেন্টস

কমেন্টস