আরেকজন ম্যারাডোনা পাবে কি আর্জেন্টিনা?

মহিউদ্দিন আল মাহিঃ 

আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আমেরিকার একটি রাষ্ট্র। বুয়েন্স আয়ার্স দেশটির বৃহত্তম শহর ও রাজধানী। দেশটি দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ অংশের প্রায় পুরোটা জুড়ে অবস্থিত। আয়তনের দিক থেকে এটি দক্ষিণ আমেরিকার ২য় বৃহত্তম এবং বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম রাষ্ট্র। বর্তমান আধুনিক আর্জেন্টিনার ইতিহাসের শুরু ১৬শ শতকে স্পেনীয় উপনিবেশীকরণের মাধ্যমে সূচিত হয়েছিল।

১৭৭৬ সালে এখানে স্পেনীয় সাম্রাজ্যের অধীনে রিও দে লা প্লাতা উপরাজ্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এই উপরাজ্যের উত্তরসূরী রাষ্ট্র হিসেবে আর্জেন্টিনার উত্থান ঘটে। ১৮১০ সালে আর্জেন্টিনা স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৮১৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হয় আর্জেন্টিনার।

বর্তমান পৃথিবীর সব থেকে জনপ্রিয় ক্রিয়া আসর বলা হয় ফুটবল বিশ্বকাপকে। খেলার দুনিয়ায় বিশ্বকাপ ফুটবলের চেয়ে বড় ঘটনা হয়তো আর কিছুই হয় না। কারণ আর কোন টুর্নামেন্টই পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষকে এমন পাগল করে তুলতে পারে না। তেমনই ল্যাটিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা। যাদের পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ফুটবল ভক্ত রয়েছে।

আর্জেন্টিনার ফুটবল খেলার ইতিহাস শুরু হয় ১৮৬৭ সালে। তবে অফিশিয়ালি আর্জেন্টিনার প্রথম জাতীয় ফুটবল দল গঠিত হয় ১৯০১ সালে। তারা ল্যাটিন অঞ্চলের আরেক দেশ উরুগুয়ের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম একটি প্রীতি ম্যাচ খেলায় মুখোমুখি হয়। যেখানে নিজেদের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩–২ ব্যবধানে জয় লাভ করে। এটি ছিল আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে প্রথম নথিভুক্ত আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ১৯০১ সালের ১৬মে মোন্তেবিদেওতে খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আর্জেন্টিনার ঐ ঐতিহাসিক প্রথম দলটির সদস্য ছিলেন- আর ডব্লিউ রুদ, ডব্লিউ লেসলি, এ সি এ্যডিকট, এ এ ম্যাক, এইচ র‌্যাটক্লিফ, ই এল ডুগান, জি ই লেসলি, জে ও অ্যান্ডারসন (চ্যাপ্টার), এস ইউ লিওনার্ড, ই ডিকিনসন এবং জি এন ডিকিনসন।

লোমাস অ্যাথলেটিক এবং অ্যালামনাইয়ে ঐ দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ের ডাক পড়ে, যাদের অনেকেই আর্জেন্টিনার ফুটবলে অপেশাদার যুগের সর্বাধিক সফল দলের মধ্যে ছিলেন। এরপর উরুগুয়ের বিরুদ্ধেই নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচ একই মাঠে খেলে। এরপর ১৯৩০ সালের প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠলেও আয়োজক উরুগুয়ের কাছে হেরে রানার্সআপ হয়।

এরপর ১৯৩৮ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘদিন ম্যাচ না খেলার বিরতি ছিল আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের। এমনকি তিনটি বিশ্বকাপে তারা বিভিন্ন কারণে অংশগ্রহণ করেনি। ১৯৩৮ সালে ফিফা বিশ্বকাপের আয়োজন করে ফ্রান্স। টানা দ্বিতীয়বার ইউরোপে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবার ফলে ইউরোপে যেয়ে এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেয় আর্জেন্টিনা এবং উরুগুয়ে।

এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে কয়েক বছর বিশ্বকাপ বন্ধ ছিল। বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে। কিন্তু ব্রাজিলীয় ফুটবল সংস্থার সাথে দ্বন্দ্বের কারণে এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেনি আর্জেন্টিনা। এরপর ১৯৫৪ সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপেও অংশগ্রহণ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে তারা। টানা তিনটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করলেও এই সময়ের মধ্য আর্জেন্টিনা ১৯৩৭, ১৯৪১, ১৯৪৫, ১৯৪৬, ১৯৪৭, ১৯৫৫ ও ১৯৫৭ সালে দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা জেতে।

দীর্ঘ ২৪ বছর বিরতির পর ১৯৫৮ সালে সুইডেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা অংশগ্রহণ করে। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে তখনকার তারকা প্লেয়ার ম্যাশিও, অ্যাঞ্জিলিলো এবং সিভরির মত খেলোয়াড়রা অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও আর্জেন্টিনা দলটি সাজানো হয়েছিলো অ্যামাদিও ক্যারিজো, পেদ্রো দেলাচা, হোসে র‍্যামোস দেলগ্যাদো, অরেস্তে করবাতা, অ্যাঞ্জেল লাব্রুনা এবং হোসে স্যানফিলিপোর মত তারকা খেলোয়াড়দের নিয়ে।

কিন্তু অতীতে তাদের ইউরোপের দলগুলোর মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক কম থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় আর্জেন্টিনা দলের। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম খেলায় তারা পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানে পরাজিত হয়। দ্বিতীয় খেলায় উত্তর আয়ারল্যান্ডকে হারালেও গ্রুপের শেষ এবং তৃতীয় খেলায় চেকস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ৬–১ ব্যবধানে পরাজিত হয় তারা। যেটা ছিল আগের সব বিশ্বকাপে কোন দলের সর্বোচ্চ ব্যবধানে পরাজয় হওয়ার রেকর্ড। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার এই ঘটনাকে পরবর্তীতে ‘এল দিজাস্ট্রে দি সুইসিয়া’ ইংলিশ শব্দে যাকে (দ্য সুইডেন ডিজাস্টার)  নামে পরবর্তীতে পরিচিতি পায়।

এরপর ১৯৬২ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার ভাল যায়নি। চিলিতে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপ ছিল ফিফা আয়োজিত ৭ম বিশ্বকাপ। প্রথম পর্বের প্রথম খেলায় বুলগেরিয়াকে ১–০ ব্যবধানে পরাজিত করে আর্জেন্টিনা দল। দ্বিতীয় খেলায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩–১ ব্যবধানে পরাজয় এবং শেষ খেলায় হাঙ্গেরির সাথে ড্র করায় প্রথম পর্বে তিন পয়েন্ট অর্জন করতে সক্ষম হয় আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনা এবং  ইংল্যান্ডের সমান তিন পয়েন্ট হলেও গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় আবারো কপাল পোড়ে সেলেসাওদের। বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকে সেবারো বিদায় নিতে হয় আর্জেন্টিনাকে।

বিশ্বকাপের টানা ব্যর্থতার কারণে সেদেশের ফুটবল সংস্থা আর্জেন্টিনীয় ফুটবলে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। ১৯৭৪ সালে আর্জেন্টিনীয় ফুটবল সংস্থার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন দেভিদ ব্র্যাকুতো। তিনি সিজার লুইস মেনত্তিকে কোচ হওয়ার জন্য আমন্ত্রন জানান। মেনত্তি কিছু শর্তের বিনিময়ে কোচ হওয়ার জন্য রাজি হন। তার শর্তের মধ্যে একটি হল, পঁচিশ বছরের কম বয়সি কোন খেলোয়াড়কে বিদেশী কোন ক্লাবে বিক্রয় করা যাবেনা।

১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মত ফুটবল বিশ্বকাপ নিজেদের মাটিতে আয়োজন করার সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের জন্য লম্বা প্রস্তুতি নিতে শুরু করে তারা। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে তেত্রিশটি প্রীতি খেলায় অংশগ্রহন করে তারা। ১৯৭৭ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে খেলায় আর্জেন্টিনা দলের হয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে অভিষেক হয় ফুটবলের জাদুকর দিয়েগো ম্যারাদোনার। যদিও নিজেদের দেশের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলা হচ্ছিল তাঁকে, তবে মাত্র ১৬ বছর বয়েসের কারণে জাদুকর সেই মারাদোনা কে দলের কোচ মেনত্তি তাকে প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিলেন।

১৯৭৮ সালের ২৫ জুন, ইতিহাসের প্রথম আর্জেন্টিনা তাদের নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপের ফাইনাল উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইস্ত্যাদিও মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। সে ম্যাচে খেলার ৩৮তম মিনিটে দলকে প্রথম এগিয়ে নিয়ে যান মারিও কেম্পেস। খেলার ৮২তম মিনিটে নেদারল্যান্ডসের নানিঙ্গার গোলে সমতায় ফেরে নেদারল্যান্ডস। খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে, তারপর ১০৪তম মিনিটে কেম্পেস খেলায় তার নিজের দ্বিতীয় গোল করে আবারও এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। এরপর ১১৫তম মিনিটে বার্তোনির গোলে ৩–১ নিজেদের গোলের ব্যবধান দিগুন করে সেলসাওরা। অবশেষে ফাইনালে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জয় নিশ্চিত করে তারা। ৬ গোল নিয়ে প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ গোলদাতা হন আর্জেন্টিনার মারিও কেম্পেস।

এরপর ১৯৮৫ সালের মে মাসে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্রথম খেলায় ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে ৩–২ ব্যবধানে জয় লাভ করলেও আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব টপকাতে অনেক দূর্ভোগ পোহাতে হয় বিলার্দোর শিষ্যদের। সেবার আর্জেন্টিনা দিয়েগো মারাদোনার জন্য অনেক আশা নিয়ে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে।

সেবার অনায়াসে গ্রুপ পর্ব এবং দ্বিতীয় পর্ব পার করে আর্জেন্টিনা ফুটবল দল। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা এবার মুখোমুখি হয় শক্তিশালী ইংল্যান্ডে দলের বিপক্ষে। খেলার প্রথমার্ধ গোলশূন্য ভাবে শেষ হয়। খেলার দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার ছয় মিনিট পর বিশ্ব দেখতে পায়্র ফুটবলের মাঠে ফুটবল ঈশ্বর মারাদোনার নামে একটি মানুষরূপী ঈশ্বরের। তবে পায়ের খেলায় তিনি গোলটি সেইদিন হাত দিয়ে করেছিলেন।

পরবর্তীতে তিনি নিজের হাত দিয়ে করা গোলের নাম দেন ‘ল্যা মানো ডি ডিওস’। বাংলায় যার অর্থ (ঈশ্বরের হাত)। এই গোলের ঠিক চার মিনিট পর তিনি আরও একটি গোল করে ব্যবধান দ্বিগুন করেন। এই গোলটি কে শতাব্দির সেরা গোল হিসেবে খ্যাতি দেয়া হয়েছে। মারাদোনা পুরোপুরি একক নৈপূণ্যে পাঁচজন ইংরেজ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে এবং গোলরক্ষকে বোকা বানিয়ে গোলটি করেছিলেন। আর্জেন্টিনা সেই খেলায় ২–১ ব্যবধানে জয় লাভ করে।

সেমিফাইনালে মারাদোনার জোড়া গোলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২–০ ব্যবধানে জয় লাভ করে আর্জেন্টিনা। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে শাসরুদ্ধকর খেলায় ৩–২ ব্যবধানে জয় লাভ করে তারা। এটি ছিল তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা। বিশ্বকাপে ছয়টি খেলার পাঁচটিতে জয় লাভ করে আর্জেন্টিনা। সেবার দূর্দান্ত নৈপূণ্য প্রদর্শন করে দলকে শিরোপা এনে দেন দিয়েগো মারাদোনা। তিনি পাঁচ গোল করে প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। তাকে প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত করা হয় এবং স্বর্ণজুতা পুরস্কার দেওয়া হয়।

এরপর ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১০ এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে ফাইনাল হেরে শিরোপা খরা থাকে আর্জেন্টিনা। আর এবার নতুন করে রাশিয়ায় শুরু হতে ২০১৮ ফুটবল বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ শুরু হবে এবছরের ১৪ জুন। আর এবার শিরোপা খরা কাটাতে আর্জেন্টাইন ফুটবল ভক্তরা চেয়ে আছে তাদের আরেক জাদুকর খেলোয়াড় লিওনেল মেসির দিকে। এখন দেখার বিষয়, আর্জেন্টাইন ‘নাম্বার টেন’ এই বিশ্বকাপে নিজে কতোটা সফল হন আর দলকে কোথায় নিয়ে যান!

কমেন্টস

কমেন্টস