ধর্ষণ হবার ভয়ে ভারতে আসতে চান না এক নম্বর তারকা

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

ভারতে নারীদের ওপরে হেনস্থা ভারতে ক্রমবর্ধমান। ধর্ষণ, যৌন হেনস্থা, অত্যাচারের কারণে ভারত প্রায়ই পাশ্চাত্য সংবাদমাধ্যমে শিরোনামে আসে। ঠিক এই কারণ দেখিয়েই বিশ্ব যুব স্কোয়াশ চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিলেন সুইজারল্যান্ডের আমব্রে আলিঙ্কস।

বিশ্ব যুব স্কোয়াশ চ্যাম্পিয়নশিপের আসর বসেছে চেন্নাইয়ে। এই চেন্নাইতেই কিছু দিন আগে ১১ বছরের নাবালিকাকে ধর্ষণ-কাণ্ডে অভিযুক্ত হয়েছে ১৭ জন। শুধু চেন্নাই-ই নয়, ভারতের বহু স্থান থেকেই প্রতিদিন এ রকম খবর ভেসে আসে। আসিফা, গীতার মতো নাবালিকার বিরুদ্ধে হিংসায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল গোটা বিশ্ব। এমনই যৌন-লোলুপ দেশে তাই নিজের মেয়েকে পাঠানোর ঝুঁকি নেননি আমব্রে আলিঙ্কস-এর বাবা-মা। ঘটনাচক্রে তিনিই আবার দেশের এক নম্বর তারকা।

সুইজারল্যান্ডের কোচ পাসকাল ভুরিন বলেছেন, ‘‘আমব্রে আমাদের স্কোয়াডের এক নম্বর তারকা। তবে ওর বাবা-মা চায়নি বলে আসতে পারল না। বেশ কিছু দিন ধরেই নেট দুনিয়ায় ভারতের ক্রমবর্ধমান যৌন হেনস্থার কথা ওঁদের কাছে পৌঁছেছিল। তাই নিজের মেয়েকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।’’

তবে শুধু সুইজারল্যান্ডই নয়, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরানের মতো দেশও ভারতে দল পাঠানোর আগে নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ইরানের তারকা নিকির পিতা আমির জানিয়েছেন, ‘‘এ দেশের সংস্কৃতি, ভাষা— দুটিই আমাদের অচেনা। তাই মেয়েকে সব সময়ে দলের সঙ্গে থাকতে বলেছি।’’ অস্ট্রেলিয়ার অ্যালেক্স হেডেন জানিয়েছেন, ‘‘বিদেশে খেলতে গেলে সব সময় আমার অভিভাবক সঙ্গে থাকেন। এমনকী নিউজিল্যান্ডে গিয়েই বাইরে ঘুরতে সমস্যা হয়নি। তবে ভারতে আমাদের সঙ্গে সব সময়ে এক জন পুরুষ থাকছেন।’’

‘আমি কলেজে ভর্তির ফর্ম জমা দিতে গিয়েছিলাম। লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম, হঠাৎই পেছন দিক থেকে কেউ আমার গোপনাঙ্গ যেন ছুঁয়ে দিল।’

বিক্রম শুধু এইটুকু বলেছে, আর সেটা শুনেই ওর পাশে বসা তিন বন্ধু হো হো করে হাসতে শুরু করল। তারপরে তারা বিক্রমকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আচ্ছা তারপরে কী হল!

একটু দম নিয়ে বিক্রম বলতে শুরু করেছিল, যতক্ষণ ওই ফর্ম জমা দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম বারে বারে ওই ভদ্রলোক একই জিনিষ করছিলেন। দেখে মনে হচ্ছিল তাঁর বয়স ৫০ এর বেশিই হবে।

আর আমি তখন সবে কলেজে ভর্তি হচ্ছি। আমি ওঁকে যখন বললাম, যে আঙ্কল, ঠিক করে দাঁড়ান, তিনি অল্প হেসে বলেছিলেন, ‘কী এমন হল তোমার!’

দিল্লিতে চাকরিরত বিক্রমের সঙ্গে এই ঘটনা প্রায় আট বছর আগেকার। কিন্তু এখনও ঘটনাটা সম্পূর্ণ মনে আছে ওর।

‘ভদ্রলোকের বয়স বিবেচনা করে অনেকক্ষণ ধরে সহ্য করছিলাম। কিন্তু শেষে রেগে গিয়ে উল্টোপাল্টা বলেছিলাম,’ জানাচ্ছিলেন বিক্রম।

বিবিসিকে বিক্রম বলছিলেন যে, এতগুলো বছরে তিনি ওই ঘটনার কথা প্রথমবার খোলাখুলি কাউকে বলছেন যে, সংবেদনশীল হয়ে গোটা বিষয়টা শুনবে।

বিক্রম যখন সংবেদনশীলতার কথা বলছিলেন, তখন তার পাশে বসা তিন বন্ধু কোনো মতে হাসি চাপছিল।

উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা কপিল শর্মা এখন দিল্লিতে চাকরি করেন।

তিনি বিবিসিকে জানিয়েছেন, তার বয়স যখন আরও কিছুটা কম ছিল, সেই সময়ে বাসে বসার জায়গা দেয়ার নাম করে এক ব্যক্তি বারে বারে তাঁর গোপণাঙ্গে হাত দিচ্ছিল।

এই দুটি ঘটনাই বলে দিচ্ছে যে শুধু নারী বা কন্যাশিশুরা নয়, পুরুষরাও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

পুত্রশিশুদের ওপরে যৌন হয়রানির ঘটনা নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ প্রায় দায়ের হয় না বললেই চলে, তাই এর কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায় না।

তবে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বলছে, যত সংখ্যক কন্যাশিশুর ওপরে ভারতে নির্যাতন হয়, প্রায় সমসংখ্যক পুত্রশিশুও যৌন হয়রানির শিকার হয়।

সেই সঙ্গে প্রকাশ্যে পুরুষদের দ্বারা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের যৌন হয়রানির ঘটনারও কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।

জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী প্রকাশ্যে গোপনাঙ্গে হাত দেয়ার মতো হয়রানি সবথেকে বেশি হয় দিল্লি, মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র, ভোপাল, মহারাষ্ট্রের নাগপুর এবং ছত্তিশগড়ের শিল্পশহর দুর্গ-ভিলাইনগরে ঘটে।

কিন্তু এই পরিসংখ্যানে কেবল পুরুষদের দ্বারা নারীদের গোপণাঙ্গে হাত দেওয়ার ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যের অসম্মতিতে গোপণাঙ্গে হাত দেয়া একটি মানসিক বিকৃতি, যাকে ফ্রোটেরিজম বলা হয় মনোবিজ্ঞানে। সেই কাজটি কেন করে একজন পুরুষ?

দিল্লির মনোবিজ্ঞানী প্রবীণ ত্রিপাঠি বলছেন, ‘এই মানসিক রোগের শিকার ব্যক্তিরা অন্যের সম্মতি না নিয়ে তার গোপণাঙ্গ ছুঁয়ে যৌন তৃপ্তি লাভ করেন।

যৌন নিপীড়নের বেশীরভাগ ঘটনাই নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য করা হয়। আর যেখানে কোনো পুরুষ অন্য পুরুষের ওপরে এই নিপীড়ন চালাচ্ছে, সেখানে নিজের শক্তি আরও বেশি করে প্রদর্শন করার একটা বিকৃত আনন্দ তো আছেই।’

হয়রানির শিকার হওয়া যে দুজনের সঙ্গে বিবিসি কথা বলেছে, তারা এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো বলছে পুত্রশিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ওপরে যে যৌন নির্যাতন হতে পারে, সেটা তাদের আত্মীয়, বন্ধুরা বিশ্বাসই করবেন না।

হেসে উড়িয়ে দেবেন, এই আশঙ্কায় পুরুষেরা কাউকে জানায়ই না ঘটনাগুলো।

আর পুরুষদের যেহেতু স্বাভাবিকভাবে শক্তিমান বলে মনে করা হয়, তাই তাদের ওপরে কেউ প্রকাশ্যে যৌন হেনস্থা করবে, এটা কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না। উল্টে হয়রানির শিকার হওয়া পুরুষদেরই কমজোরি মনে করবে।

বিক্রম সিং এবং কপিল শর্মাও ঠিক এই কথাই জানিয়েছেন বিবিসিকে।

ভারতে পুরুষদের ওপরে যৌন নির্যাতনের বিচার করার জন্য আলাদা কোনো আইন নেই। অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যা আর পুত্রশিশুদের ওপরে নির্যাতন অবশ্য ‘পকসো আইনে’ বিচার হয়।

আইনজীবীদের একাংশ মনে করেন যে ভারতীয় দণ্ডবিধির যে সব ধারায় যৌন হয়রানির বিচার হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে নারীদের ওপরে নির্যাতনের কথা রয়েছে। পুরুষরা যৌন হয়রানির শিকার হলে সেই ধারায় বিচার পেতে পারেন না।

কিন্তু আইনজীবীদেরই আরেকটি অংশ মনে করে ওই একই ধারায় পুরুষরাও যৌন হয়রানির শিকার হলে অভিযোগ জানাতে পারেন। তদন্তও একই আইনেই সম্ভব।

কমেন্টস

কমেন্টস