দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কোরিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

সেই ১৯৪৫, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন। সেসময়য় ১৯৪৫ সালের দিকে কোরীয় উপদ্বীপে টানা ৩৫ বছরের জাপানি সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। এরপর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে কোরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তরাঞ্চলে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে ১৯৫৩ সালে তিন বছরের কোরিয়া যুদ্ধ শেষে সমাজতান্ত্রিক পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের আরও অবনতি হয়।

এরপর টানা ৩৫ বছর কোরীয় উপদ্বীপে জাপানি শাসনের সময়কাল চলে। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জাপান কোরিয়া ছাড়তে বাধ্য হয়। এ সময় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে কোরিয়ার দুটি অংশে নিয়ন্ত্রণ নেয় যুক্তরাষ্ট্র এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। ৩৮ অক্ষাংশ বরাবর ভাগ করা হয় উপদ্বীপটিকে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত দক্ষিণ কোরীয় নেতা রি সিংম্যানকে নানাভাবে সহায়তা করে ওয়াশিংটন এবং উত্তরে কিম জং উনের দাদা কিম ইল সুং’কে সহায়তা দেয় মস্কো। পরে চীনও এগিয়ে আসে উত্তর কোরিয়ার সহায়তায়। রি সিংম্যান ও কিম ইল সুং দুজনেই জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধী ছিলেন; তবুও ১৯৪৫ পরবর্তী জাপানমুক্ত কোরিয়া কখনও এক হতে পারেনি।

এরপর টানা ৩ বছর পর্যন্ত কোরিয়ার দক্ষিণাংশে চলতে থাকে মার্কিন সেনাবাহিনীর শাসন। এরই মধ্যে ১৯৪৮ সালের ২০শে জুলাই প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় রি সিংম্যানের দক্ষিণ কোরিয়ায়। দেশটিতে চালু হয় প্রেসিডেন্ট শাসন, শুরু হয় পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থা।

অন্যদিকে, সোভিয়েত ও চীনের নিয়ন্ত্রণে উত্তর কোরিয়া হাঁটতে থাকে সমাজতান্ত্রিক পথে। তবে একক কোরিয়া প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে তারা ২৫শে জুন ১৯৫০ সালে দক্ষিণে আক্রমণ চালয়। ইতিহাসে যা ”কোরীয় যুদ্ধ” নামে পরিচিত। প্রায় তিন বছর পর ১৯৫৩ সালের ২৭শে জুলাই অস্ত্রবিরতির মধ্য দিয়ে এ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষিত হয়নি কখনও। দুই কোরীয় রাষ্ট্রের মাঝখানে অবস্থিত চার কিলোমিটার এলাকা সেসময় তৈরি হয় কোরীয় অসামরিক অঞ্চল হিসেবে।

যুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে থাকে দক্ষিণ কোরিয়ায়। আর সোভিয়েত তথা রাশিয়া ও চীনের সহায়তা পেতে থাকে উত্তর কোরিয়া। তবে বিভিন্ন সময় রুশ ও চীনা নীতি বদলের জেরে নানাভাবে প্রভাবিত হয় কিম ইল সুংয়ে’র দেশ। এছাড়া, ৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ায়, তুলনামূলক দুর্বল হয়ে পড়ে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এতে মস্কোর পক্ষ থেকে কমতে থাকে সাহায্য-সহযোগিতা।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রভাবে দক্ষিণ কোরিয়া বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে যেতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে গড়ে তোলে বিদেশে তাদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটিগুলোর একটি। এ সময় অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া উত্তর কোরিয়া তার সার্বভৌমত্ব ও কম্যুনিস্ট সত্ত্বা বজায় রাখার জন্য মনোযোগী হয় সমরসজ্জার দিকে। এর মধ্যে, দাদা সুং ১৫টি, বাবা ইল ১৬টি এবং ছেলে কিম গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮০টি ছোটবড় ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালান। ১৯৮৪ সালের ”স্কাউড-বি” ছিল উত্তরের প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা।

১৯৯৪ সালে কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর পর তার পুত্র কিম জং ইল ক্ষমতায় এসে পরমাণু অস্ত্র তৈরির গবেষণা আরও শক্তিশালী করেন। ২০১১ সালে তার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন কিম জং ইলের পুত্র কিম জং উন। তার সাত বছরের শাসনামলে ছয়বার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায় উত্তর কোরিয়া। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের টানাপড়েন চরমে পৌঁছায়।

২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এ-বিরোধ এমন অবস্থায় পৌঁছায় যে, অনেকেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করতে থাকেন। যদিও ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে আকস্মিকভাবে পরমাণু পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসার প্রস্তাব গ্রহণ করেন কিম জং উন।

আর সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ১১ই জুন, ২০১৮ সিঙ্গাপুরে মুখোমুখি বৈঠকে বসেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার প্রধান নেতা কিম জং উন। সেদিন স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল ৯টায় সিঙ্গাপুরের সেন্তোসা দ্বীপের ক্যাপেলায় হোটেলে এই বৈঠক শুরু হয়।

কমেন্টস

কমেন্টস