ভারতে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী নীতির কাছেই কি হার মানছে আসিফারা?

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ 

সম্প্রতি ভারত শাসিত কাশ্মীরে মুসলিম শিশু আসিফার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পিছনের কারণ ধর্ম বৈষম্য। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক দল মুসলিম যাযাবর সম্প্রদায়কে তাড়াতে ধর্ষণের মূল পরিকল্পনা চালায় মন্দিরের দায়িত্বরত কর্মকর্তাসহ পুলিশের সহযোগিতার কথা। আর এই ধর্ষণের ঘটনায় প্রকাশ্য সমর্থনও দিয়েছে দেশটির ক্ষমতাধর বিজেপি সরকারের রাজ্য নেতারা। এমনকি দেশটির হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো প্রকাশ্যেই অপরাধীদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে। তবে অন্যদিকে শিশু আসিফার জন্য সারা ভারত এখন আন্দোলনে উত্তাল। বিজেপি সরকারের বৈষম্য নীতিরও বিরোধীতা করছে দেশটির সাধারণ জনগণ।           

তবে কি এই বিজেপি সরকারের প্রকাশ্য সমর্থনেই ধর্ম আর সাম্প্রদায়িক ক্ষমতার একক আধিপত্ব বিস্তার ছড়াচ্ছে ভারতে? আর বিজেপি সরকারের কট্টর হিন্দুত্ববাদী নীতির কাছেই কি হার মানছে আসিফার মত শিশুরা?

অভিযুক্তদের পক্ষ নিয়ে বিজেপি ও হিন্দু সংগঠন গুলোর বিক্ষোভ

ক্রাইম ব্রাঞ্চের তদন্তে যখন একের পর এক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হতে থাকেন, তখন থেকেই শুরু হয় প্রতিবাদ।

প্রথমে স্থানীয় একটি সদ্য গঠিত হিন্দু সংগঠন বিক্ষোভে নামে। সেখানে হাজির ছিলেন বিজেপির বেশ কিছু নেতা-কর্মী।
তাদেরই একজন, বিজেপি-র সাধারণ সম্পাদক ও বিধানসভার সদস্য অশোক কউল বিবিসির প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছিলেন, “এলাকার মানুষের সঙ্গে তো থাকতেই হবে। তবে দলের তরফে এই ঘটনার নিন্দা তো করাই হয়েছে। আর আমরা চাইছি কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো – সিবিআইকে দিয়ে তদন্ত করানো হোক।”

বিজেপিও জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যে সরকারের অংশীদার।

ঐরকম একটি বিক্ষোভ মিছিলের ছবি রয়েছে বিবিসির কাছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে মিছিলকারীদের হাতে রয়েছে ভারতের জাতীয় পতাকা।

ওই বিক্ষোভ মিছিলের পরে মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি টুইট করে মন্তব্য করেছিলেন, “ধর্ষণের অভিযোগে ধৃতদের পক্ষ নিয়ে মিছিল হচ্ছে দেখে আমি হতবাক হয়ে যাচ্ছি। এইসব বিক্ষোভে আবার জাতীয় পতাকা রয়েছে! আমি আতঙ্কিত। এটাতো জাতীয় পতাকার অবমাননা।”

এরপরেই অবশ্য বিজেপির নেতৃত্ব ওইসব বিক্ষোভ থেকে নিজের দলের লোকদের সরিয়ে নেন।

তবে এবার বিক্ষোভে নামে আইনজীবীরা।

গ্রেপ্তারীর প্রতিবাদে জম্মুতে যে হরতাল হয়েছিল ১১ই এপ্রিল, তাতে যুক্ত হয়ে রাস্তায় নেমেছিল বার এসোসিয়েশন।

তবে সব আইনজীবী বা বার এসোসিয়েশন যে এই ঘটনায় ধৃতদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন, এমনটা নয়।

ক্রাইম ব্রাঞ্চের কর্মকর্তারা যাতে চার্জশীট পেশ না করতে পারেন, তার জন্য রীতিমতো ঘেরাও চলতে থাকে।

আদালত চত্বরেই চলতে থাকে স্লোগান। শেষমেশ অনেক রাতে ক্রাইম ব্রাঞ্চের কর্মকর্তারা চার্জশীট জমা করতে সক্ষম হন।
ওই কন্যা শিশুর পিতা বিবিসিকে বলেছেন, “যখন দেখছিলাম মেয়ের ওপরে অত্যাচারীদের সমর্থনে জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল হচ্ছে, মনে হল আমার মেয়েটা আরও একবার ধর্ষিতা হল।”

চার্জশীটে আনা অভিযোগ

জম্মু-কাশ্মীর রাজ্য পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ বলছে, আট বছরের ঐ কন্যা শিশুকে জম্মু-র কাঠুয়া জেলায় তার বাড়ির কাছ থেকে অপহরণ করা হয়েছিল।

যাযাবর গুজ্জর জাতি-গোষ্ঠী শিশুটিকে এবছরের ১০ই জানুয়ারি অপহরণ করা হয়, যখন সে পোষা ঘোড়া আর ভেড়াগুলিকে চড়াতে নিয়ে গিয়েছিল।

পরের দিন তার পরিবার হীরানগর থানায় অপহরণের মামলা দায়ের করে। সাত দিন পরে তার মৃতদেহ পাওয়া যায় কাঠুয়া জেলারই বসানা গ্রামে।

ঘটনাটি নিয়ে ধীরে ধীরে ক্ষোভ বিক্ষোভ বাড়তে থাকে, একসময়ে বিষয়টি পৌঁছায় রাজ্য বিধানসভায়। সেখানেই মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি ক্রাইম ব্রাঞ্চকে দিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার কথা ঘোষণা করেন।

তদন্তের শুরুতেই দেখা যায় যে ওই কন্যা শিশুর খোঁজ করতে পুলিশ কর্মীরা যখন জঙ্গলে গিয়েছিলেন, তার মধ্যেই এমন দুজন ছিলেন, যারা মৃতদেহটির পোশাক পরীক্ষার জন্য পাঠানোর আগে একবার জলে ধুয়ে নিয়েছিল।
সন্দেহ বাড়ায় তাদের জেরা শুরু হয়।

ফেব্রুয়ারি মাসের গোড়ার দিকে ঐ দুজন পুলিশ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা দুজনেই ওই হীরানগর থানায় কর্মরত ছিলেন।
তল্লাশি চালিয়ে বসানা গ্রামের একটি মন্দির থেকে কিছু চুল খুঁজে পান তদন্তকারীরা। তাঁদের সন্দেহ হয় যে ঐ চুল অপহৃত কন্যা শিশুটির হতে পারে।

চার্জশীটে বলা হয়েছে, ওই মন্দিরের দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন সাঞ্জি রাম নামে যে ব্যক্তি, তিনিই নিজের পুত্র আর ভাইপোর সঙ্গে ওই কন্যা শিশুকে অপহরণ করার পরিকল্পনা করেছিলেন।

গুজ্জর সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করাই উদ্দেশ্য ছিল, যাতে তারা ওই এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

চার্জশীটে বলা হয়েছে, স্থানীয় হিন্দুদের মধ্যে এরকম একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে বাকারওয়াল বা যাযাবর সম্প্রদায়ের ওই মানুষরা গরু জবাই করে আর মাদকের কারবার করে।

এ নিয়ে এর আগে দুই তরফেই পুলিশের কাছে বহু অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ জমা হয়েছে।

চার্জশীটে পুলিশ এটাও উল্লেখ করেছে যে ধর্ষণের আগে ঐ মন্দিরে কিছু পুজোও করা হয়।

৬০ বছর বয়সী সাঞ্জি রাম, তার ছেলে বিশাল আর নাবালক ভাইপো, চার পুলিশ কর্মী এবং আরেক ব্যক্তি গোটা ঘটনায় সরাসরি যুক্ত।

ঐ কন্যা শিশুকে অপহরণ করে নিয়ে আসার পরে তাকে মাদক খাইয়ে অচেতন করে রাখা হয়েছিল। তার মধ্যেই তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়।

অভিযুক্তদের মধ্যে যে নাবালক রয়েছে, সে তার চাচাতো দাদা সাঞ্জি রামের ছেলে বিশালকে উত্তর প্রদেশের মীরঠ শহর থেকে ডেকে আনে ফোন করে যাতে, সে-ও ওই কন্যা শিশুটিকে ধর্ষণ করতে পারে।

চার্জশীটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, টানা ধর্ষণ করার পরে যখন অভিযুক্তরা ঠিক করে যে এবার ওই কন্যা শিশুটিকে মেরে ফেলার সময় হয়েছে, তখন একজন অভিযুক্ত পুলিশ কর্মী অন্যদের বলে, “এখনই মেরো না। দাঁড়াও। আমি ওকে শেষবারের মতো একবার ধর্ষণ করে নিই।”

তারপরে ওই পুলিশ কর্মী নিজে চেষ্টা করে কন্যা শিশুটিকে হত্যা করতে, কিন্তু সে ব্যর্থ হয়। শেষে নাবালক অভিযুক্তই ওই কন্যা শিশুকে হত্যা করে।

তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে মাথা থেঁতলে দেওয়া হয় একটা পাথর দিয়ে।

ময়নাতদন্তে জানা গেছে যে ওই কন্যা শিশুটিকে মাদকের বড়ি খাইয়ে তারপরে ধর্ষণ করা হয়েছে।

ভারতে নারীদের অবস্থান

মেয়েটির বয়স নয় থেকে ১১ বছরের হবে। সম্প্রতি গুজরাটের সুরাট শহরের একটি খেলার মাঠের কাছে ঝোপের ভেতর তার ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরের ৮৬টি জখমের চিহ্ন ছিল।

যে চিকিৎসক ময়না তদন্ত করেছেন, তার ধারণা এক সপ্তাহ ধরে হয়তো নির্যাতন করা হয়েছে মেয়েটিকে। পুলিশেরও ধারনা মেয়েটিকে আটকে রেখে এভাবে নৃশংসভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।

কিন্তু মৃতদেহ পাওয়ার দশ দিন পরও মেয়েটির পরিচয় বের করতে পারেনি পুলিশ। গুজরাটের ৮০০০ নিখোঁজ শিশুর ফাইল ঘেঁটেও কোনো সুরাহা করতে পারেনি তারা।

দিল্লিতে বিবিসির সৌতিক বিশ্বাস বলছেন, ভারতে দুর্বলদের ওপর সবলদের কর্তৃত্ব ফলাতে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। শ্রেণী-বৈষম্য এবং পুরুষ-শাসিত যে সমাজে হিংসা ছড়িয়ে ভোট পাওয়ার চেষ্টা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, সেখানে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণের ঘটনাকে স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে দেখছেন অনেকেই।

মূলত মেয়ে ভ্রূণ হত্যার কারণে ভারতে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা কম। প্রতি ১০০ মেয়ে শিশুর জন্মের তুলনায় ১১২ টি ছেলে শিশু জন্ম নেয়। এ কারণে, স্বাভাবিকের চেয়ে নারীর সংখ্যা ভারতে প্রায় ছয় কোটি ৩০ লাখ কম।

অনেকেই বিশ্বাস করেন, পুরুষের সংখ্যা অস্বাভাবিক বেশি হওয়ার কারণে নারীর ওপর যৌন নির্যাতন বাড়ছে।

নারী ও পুরুষের সংখ্যার অনুপাতে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের চিত্র সবচেয়ে খারাপ। এবং এ রাজ্যে গণ ধর্ষণের সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি।

এক জানুয়ারি মাসেই, ১০ বছরের একটি মেয়েকে ধর্ষণ করার দায়ে ৫০ বছরের এক পুরুষকে আটক করা হয়, সাড়ে তিন বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ১৫ বছরের একটি বালককে আটক করা হয়, ২০ বছরের এক বিবাহিতা নারীকে ধর্ষণ করে দুই পুরুষ; চাষের জমিতে পাওয়া যায় একটি মেয়ে শিশুর ক্ষত-বিক্ষত দেহ। এসব ঘটনা পুলিশের খাতায় উঠেছে। এমন অনেক ঘটনাই পুলিশের কাছেই আসেনা।

ভারত শাসিত কাশ্মীরে একটি মুসলিম যাযাবর সম্প্রদায়ের আট বছরের একটি মেয়ে শিশুকে মন্দিরে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনা পুরো ভারতকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। বলা হচ্ছে, মুসলিম ঐ যাযাবররা যেন তাদের এলাকায় ছাগল চরাতে না আসে, সেটা নিশ্চিত করতে ঐ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

অনেক মানুষ এই ঘটনা প্রকাশ্যে সমর্থনও করেছে। অভিযুক্তদের সমর্থনে একটি সমাবেশে যোগ দিয়েছেন রাজ্য সরকারের বিজেপি’র দুই মন্ত্রী । সমালোচনার মুখে তারা অবশ্য পরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

কেরালা রাজ্যে একজন ব্যাংক ম্যানেজার ফেসবুকে কাশ্মীরে ঐ ধর্ষণ ও হত্যার সমর্থনে পোস্টিং দেন – “এটা না হলে ঐ মেয়েটি বড় হয়ে হয়তো ভারতের বিরুদ্ধে মানব-বোমা হয়ে হাজির হতো।” তাকে অবশ্য বরখাস্ত করা হয়।

চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টুইট করেন, “আমাদের কন্যারা বিচার পাবে।”

অনেকেই বলছেন তার এই আশ্বাস ফাঁকা বুলি।

অন্য দলের রাজনীতিকরাও ব্যতিক্রমী তেমন কিছু দেখাতে পারছেন না। ২০১৪ সালে একজন নারী সাংবাদিককে ধর্ষণ করার দায়ে তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, উত্তর প্রদেশের বড় দল সমাজবাদী পার্টির নেতা মুলায়াম সিং যাদবের মন্তব্য ছিল- “পুরুষরা ভুল করে। সেজন্য তাদের ফাঁসি দেওয়া যায়না। আমরা ধর্ষণ বিরোধী আইন বদলাবো।”

ভারতের সামাজিক এই বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে চলতে হয় নারীদের: নিজেকে রক্ষা করতে চাইলে, ঠিকমতো পোশাক পরো, পুরুষ সঙ্গী ছাড়া বাইরে যেওনা, অথবা ঘরের ভেতরে থাকো।

সবচেয়ে আশঙ্কা যেটা তা হলো এখন অধিক সংখ্যায় শিশুরা টার্গেট হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যানেই দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে শিশু ধর্ষণের ঘটনা দ্বিগুণ হয়েছে।

দেশে ধর্ষণের শিকার নারীদের ৪০ শতাংশই শিশু।

ধর্ষণ শুধু ভারতের সমস্যা নয়, কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং নারী-পুরুষের অস্বাভাবিক অনুপাতের এখানকার পরিস্থিতি অন্যদের চেয়ে খারাপ।

পাশাপাশি রয়েছে মানুষের উদাসীনতা । নারীর অধিকার বা নিরাপত্তা ভারতে কখনই নির্বাচনী ইস্যু নয়।

তবে আশার কথা যে ধর্ষণের ঘটনা বেশি বেশি করে সংবাদে আসছে। মামলা হচ্ছে বেশি।

কিন্তু হতাশার কথা যে ভারতের বিচার ব্যবস্থা এখনও রাজনৈতিক চাপের কাছে পর্যূদুস্ত। অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষকরা মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে।

এখনও ভারতে প্রতি চারটি ধর্ষণের মামলার মাত্র একটিতে অভিযুক্তরা দোষী সাব্যস্ত হয়।

কমেন্টস

কমেন্টস