ভক্তের অট্ট হাঁসির ভিতর সারাজীবন নির্বাক স্যার চার্লি চ্যাপলিন  

মহিউদ্দীন আল মাহীঃ

The first and only King of the silent world নির্বাক জগতের প্রথম এবং একমাত্র রাজা। কারণ জন্মই হচ্ছে উদ্দেশ্যহীন একটি জীবনের পথ। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা গানের লাইন আছে ‘যে তঁরে পাগল বলে তারে তুঁই বলিসনে কিছু’ তোমাকেও বলেছে মানুষ পাগল হয়ে গেছো। নাকের নিচে আলগা গোঁফ লাগিয়ে কালো স্যুট,বুট,আর টুপি পরা একটা বোবা পাগল। কিন্তু তোমার কি আসে যায় তাতে? কারণ তুমি যে বলেছিলে ক্লোজ-আপে জীবন হচ্ছে ট্রাজিডি কিন্তু লং শটে সেটা কমেডি।

তিনি কমেডি অভিনয় করে আমাদের নির্মল আনন্দ দিয়েছেন, আবার বড় পর্দায় মানবতার পতন দেখিয়ে আমাদের বোধকে করেছেন জাগ্রত। নিজের জীবনকে তাই ক্লোজ আপে ট্র্যাজেডি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, আর লং শটে তাকে বলেছেন কমেডি। জীবন তাঁকে শৈশবেই কঠিন পরিক্ষা নিয়ে নিয়েছিল। চরম দারিদ্র্য ও দুঃখ-দুর্দশায় চ্যাপলিনের শৈশব কেটেছিলো। খুব অল্প বয়সে তিনি বাবাকে হারান, এবং মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এক সময় পাগল হয়ে যান। মাত্র তেরো বছর বয়সে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন দরিদ্রতার কারণে। চ্যাপলিন বিভিন্ন ধরনের চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করলেও সবসময় অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন লালন করতেন মনের ভীতর। কারণ তাঁর জন্মের সময় তাঁর মা-বাবা দুজনেই মঞ্চের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।

জন্মগ্রহণ করেন চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন ১৮৮৯ সালের ১৬ই এপ্রিল। তাঁর পিতা চার্লস চ্যাপলিন সিনিয়র এবং মাতা হান্নাহ চ্যাপলিন। চার্লি চ্যাপলিনের জন্ম সম্পর্কিত বৈধ কোনো প্রমাণপত্র পাওয়া যায়নি, তাই তাঁর জন্ম নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। সংবাদ মাধ্যম তাঁর জন্মস্থান সম্পর্কে নানা সময়ে নানা রকম তথ্য দিয়েছে। কিন্তু চ্যাপলিনের মতে, তিনি দক্ষিণ লন্ডনের ওয়ালওর্থের ইস্ট স্ট্রিটে জন্মগ্রহণ করেছেন। বাবছিলেন একজন কসাইের পুত্র কিন্তু তিনি একজন গিতিমঞ্চের জনপ্রিয় গায়ক ছিলেন। তাই তাঁর ভীতরও অভিনয়ের ইচ্ছাটা ভালো ভাবেই লুকিয়ে লালন পালন করেন। অত্যধিক দারিদ্রের কারণে চ্যাপলিনকে তাঁর সাত বছর বয়সে ল্যামবেথ কর্মশালায় কাজের জন্য পাঠানো হয়। সাউথওয়ার্ক কাউন্সিল তাঁকে দারিদ্রের কারণে সেন্ট্রাল লন্ডন ডিস্ট্রিক্ট স্কুলে পাঠায়। চ্যাপলিন এই পরিস্থিতিকে “অবহেলিত জীবনকাল” বলে উল্লেখ করেন সেই সময়। তিনি বলেন আমরা যখন আমাদের অতীত নিয়ে পড়ে থাকার চিন্তা করি তখন আমরা আমাদের ভবিষ্যতকে জিম্মি করে ফেলি। অতীত নিয়ে ভাবতে থাকলে আমরা কেবলই নিষ্ফলা চক্রের মাঝে আবদ্ধ হয়ে যাবো। বরং আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। তিনি বলেছিলেন ‘নিচের দিকে তাকিয়ে আপনি কখন রংধনু খুঁজে পাবেন না’ তাই চ্যাপলিনের বাবা যখন মারা যান তখন তাঁর মা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন। বাবা মারাগেছে মা হাঁসপাতালে কিন্তু ভেঙ্গে পড়েননি তিনি। নিজের অন্তর্নিহিত প্রতিভায় বিশ্বাস রেখে সব বাধা পেরিয়ে তিনি লক্ষ্যে পৌঁছেছিলেন।অর্থাৎ আমরা অতীতচারী হবো কিনা তা নির্ভর করছে আমাদের উপর। আমাদের উচিত অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎের দিকে তাকানো। তাহলে কেবল আমরা কাঙ্ক্ষিত রঙধনুর দেখা পাবো। তাইতো তিনি বলেছেন ‘এই নচ্ছার পৃথিবীতে কোনও কিছুই স্থায়ী নয়’ ‘এমন কি আমাদের ঝামেলাগুলও নয়’। একজন কমেডিয়ান হয়েও তিনি বাস্তবানুগ অভিনয়কে কল্পনায় নিয়ে একা একা ভাবতেন। কিন্তু জীবনে চলার জন্য একটা জিনিষের কথা বলেছেন জীবনে চলতে গেলে কিছু টাঁকা করিও লাগে কারণ অভাবটি যে তাঁর জীবন থেকে হাঁসি টাকে কেরে নিয়ে দুঃখ টাকে সাথি করে দিয়েছিল সেই ছোট বেলায়।

১৯৩০ এর দশকে বিশ্ব রাজনীতিতে সেনাশাসিত জাতীয়তাবোধে বিরক্ত ছিলেন চার্লি। উগ্র জাতীয়তাবাদের আস্ফালন দেখে চার্লি চ্যাপলিন শঙ্কিত হয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে আমেরিকায় ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হন তিনি। ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ চলচ্চিত্রে তিনি সরাসরি হিটলারকে কটাক্ষ করেন। হিটলারের মতো সামরিক পোশাক পরে ও ছোট গোঁফ রেখে অভিনয় করেন চ্যাপলিন। ছবির শেষ দিকে পাঁচ মিনিটের একটি ভাষণে তিনি ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে সবাইকে এক হবার আহ্বান জানান। কিন্তু আমেরিকার রাজনৈতিক পরিবেশে তাঁর জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। তাঁর যুদ্ধ-বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে রাজনীতিবিদদের সন্দেহের কারণ হয়ে উঠেন, তাঁকে ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দিয়ে নানাভাবে অপদস্থ করার চেষ্টা করা হয়। এক সময় চ্যাপলিনকে আমেরিকা থেকে একবারে চলে যেতে হয়েছিলো। এত কিছুর পরও তিনি আমেরিকায় সত্যিকারের গণতন্ত্র ও শালীনতার প্রত্যাবর্তন আশা করেছেন। তিনি বলেন আমি আমেরিকাতে পুনঃপ্রবেশ করি বা নাকরি তাঁতে আমার উপর তেমন কোনও প্রভাব ফেল্বেনা। আমি বলতে চাই যে যতো দ্রুত-ঘৃণ্য আবরুধ্য পরিবেশ থেকে বেরহতে পারবো আমার জন্য মঙ্গল কারণ আমি যুক্তরাস্টের অপমান এবং জাঁকজমকে বিরক্ত। তাই স্ত্রি কে নিয়ে ১৯৫৩ সালে সুইজারল্যান্ডে পারিজমান চ্যাপলিন দম্পতি। চলচিত্র ছাড়া কিছুই চিন্তা করতে পারতেন না। তাই চ্যাপলিন তাঁর কাজের পুনঃস্বীকৃতি হিশাবে “এই শতাব্দীর চলচ্চিত্রকে শিল্প রূপে দাঁড় করানোর পিছনে তাঁর অপরিমেয় প্রভাবের জন্য” তাঁকে ১৯৭২ সালে একাডেমি এ্যাওয়ার্ডের পুরস্কার প্রদান করার ঘোষণা করে।

যেই উপহারটি নেয়ার জন্য আমেরিকায় যেতে হবে বলে প্রথমে তিনি পুরুস্কার গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করে। চ্যাপলিন এই পুরস্কার গ্রহণের ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন, কিন্তু পরে প্রায় ২০ বছর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ৪৪তম একাডেমি এ্যাওয়ার্ড পুরস্কার আয়োজনে তাঁকে ১২ মিনিট দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো হয়, যা একাডেমি পুরস্কারের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত দীর্ঘতম সময়।

তাঁর প্রতি এই সম্মাননা প্রদর্শন দেখে চ্যাপলিন আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন যেই দেশ আমাকে বিতাড়িত করেছিলো বাসস্থানহীন করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। যেই দেশ থেকে আমি চোখের পানি মুছতে মুছতে হেটে বেরহয়েছিলাম সেই দেশ বিশটি বছর পরে ডেকে এনে আমায় আবার কাঁদাল। জীবনের শেষ বেলায় এসে সর্ববোচ্চ সম্মননাভুসিত করে। চ্যাপলিন অনুষ্ঠান শেষে বের হওয়ার সময় বৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও তাঁর বুন্ধুময় ছাতাটি কে বন্ধ রেখে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হাঁটতে ছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি বলেছেন। আমি বৃষ্টিতে হাঁটতে ভালোবাসি, কারণ তখন কেউ আমার কান্না দেখতে পায় না।’ এই উক্তিটি হলো- যিনি নিজের চোখের পানি আড়াল করে শুধু মূকাভিনয়ের মাধ্যমে অগণিত মানুষের হাসির খোরাক হয়েছেন।

তাই নিজের চোখের পানি লুকাতে বৃষ্টিকে ভালোবেসেছিলেন স্যার স্পেন্সার চার্লি চ্যাপলিন।

এগারো সন্তানের বাবা চার্লি চ্যাপলিন ১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান সুইজারল্যান্ডে। ১৯৭৮ সালের ৩ মার্চ সুইজারল্যান্ডের করসিয়ার-সার- ভেভে গোরস্তান থেকে চুরি হয়ে যায় চার্লি চ্যাপলিনের মৃতদেহ। অবশেষে ১৮ মার্চ পুলিশ মৃতদেহটি উদ্ধার করে এবং পুনরায় সমাহিত করা হয় চার্লি চ্যাপলিনকে। গোটা পৃথিবীতে সবাই আজো তোমায়  ভালোবেসে স্মরণ কেনও করে তাঁর ব্যাখ্যা তুমিই তো বলে গেছো।

‘‘একটি সৃষ্টিশীল কাজের ভেতরের’’

সত্যটা যতো বেশি গভীর হবে,

সেটা ততো বেশি টিকে থাকবে,

চার্লি চ্যাপলিন।

 

কমেন্টস

কমেন্টস