কোটা সংস্কারঃ ভিসির বাসায় হামলাকারীদের পরিচয়

ডেইলি মিরর ২৪ ডেস্কঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে একটি অনুষ্ঠান চলাকালে চেয়ারে বসে বসে মানিব্যাগ ঘাঁটছিল এক কিশোর। পোশাক-আশাকে নিম্নবিত্ত। মানিব্যাগ থেকে কয়েকটি ভিজিটিং কার্ড নিচে পড়ে যায়। সেগুলো সরকারের মন্ত্রী ও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। একজন ছাত্রী পাশ থেকে বিষয়টি খেয়াল করে তাঁর বন্ধুদের বলেন। এরপর শিক্ষার্থীরা ছেলেটিকে ধরে নিয়ে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা প্রক্টরিয়াল বডির কাছে। তার নাম আবু সাইদ ফজলে রাব্বী ওরফে সিয়াম। পরে তাকে পুলিশে শপর্দ করা হয় বলে জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র।

একই সূত্র জানায়, আবু সাঈদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শরবত বিক্রি করে। এর আগে সে এফ রহমান হলের ক্যানটিনেও কাজ করত। ৮ এপ্রিল রাতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনটি সহিংস হয়ে উঠলে সাঈদ বিক্ষোভে অংশ নেয়। একপর্যায়ে সে উপাচার্যের বাসভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং ভাঙচুরও চালায়। উপাচার্যের বাসার দোতলা থেকে সাঈদ একটি মানিব্যাগ ও একটি মুঠোফোন নিয়ে আসে।

উপাচার্যের বাসভবনে ঢুকে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগে গত রোববার সাইদসহ চারজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রগুলো জানায়, বাকি তিনজনের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে কোনো তথ্য নেই। গোয়েন্দারা তদন্ত করে তাঁদের গ্রেপ্তার করেছে। এই তিনজন হলেন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র মাসুদ আলম (২৫), গাড়িচালক আলী হোসেন শেখ (২৮) ও রাকিবুল হাসান (২৬)। এঁদের মধ্যে রাকিবুল লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর ছাত্রলীগের সাবেক উপসম্পাদক। তাঁর বিরুদ্ধে লক্ষ্মীপুর ও বরিশালে পাঁচটি মামলা রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্র জানায়, প্রযুক্তিগত তদন্তের সূত্র ধরে গাড়িচালক আলী হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আলী হোসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় ভাড়ার গাড়ি চালান। তাঁর কাছে থাকা মুঠোফোনটা কোথায় পেলেন জানতে চান কর্মকর্তারা। আলী হোসেন জানান, আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র মাসুদ আলমের কাছ থেকে এক হাজার টাকায় তিনি ফোনটি কিনেছেন। এরপর পুলিশ মাসুদকে গ্রেপ্তার করে। তিনি আলিয়া মাদ্রাসার ইসলামের ইতিহাসে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন, যদিও তিনি থাকেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে ভাইয়ের কাছে। মাসুদকে গ্রেপ্তারের পরে জানা যায়, তিনি ফোনটি রাকিবুলের কাছ থেকে পেয়েছেন। রাকিবুল থাকেন আলিয়া মাদ্রাসার হোস্টেলে, তিনি মিটফোর্ড এলাকায় একটি ওষুধের দোকানের কর্মচারী বলেই সবাই জানে। এরপর পুলিশ রাকিবুলকে ধরার পড়েই অনেক কিছু জানা যায়।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, রাকিবুল ওই দিন উপাচার্যের বাসভবনের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুরেও অংশ নেন। সেখান থেকে একটি মুঠোফোন তিনি চুরি করে মাসুদকে দেন।

পুলিশ জানায়, রাকিবুল সম্পর্কে খোঁজ খবর করতে গিয়ে জানা গেল, তিনি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর ছাত্রলীগের সাবেক উপসম্পাদক। তাঁর বিরুদ্ধে লক্ষ্মীপুর ও বরিশালে পাঁচটি মামলা রয়েছে।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা জানিয়েছেন, রায়পুর পৌর ছাত্রলীগের সোহরাব-মাহিদুর কমিটির সময় উপসম্পাদক ছিলেন রাকিবুল। তবে তিনি অল্প বয়সেই বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। এ পর্যন্ত তিনি ১০-১৫ বার গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল চুরি, ইয়াবা বিক্রি, স্থানীয় মাতৃছায়া হাসপাতালে ঢুকে সেবিকার শ্লীলতাহানির চেষ্টাসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়ভাবে। রায়পুরে তাঁদের বাড়িটির নাম জিনের মসজিদ বাড়ি। পরে রায়পুর থেকে ঢাকায় চলে আসেন রাকিবুল। এরপর আর রাকিবুলের অবস্থান সম্পর্কে তাঁরা কোনো খোঁজ রাখেননি।

পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র মাসুদ আলমও নিজেকে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি উত্তর বাড্ডা ছাত্রলীগের সদস্য বলে পুলিশকে তথ্য দিয়েছেন। সে তথ্য যাচাই করা যায়নি।

যদিও বিষয়টি নিয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি। ডিবির যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন গতকাল বলেন, তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হলে বিষয়টি নিয়ে কিছু বলা যাবে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে রাকিবুলের চার দিন, আলী হোসেনের তিন দিন এবং মাসুদ ও আবু সাইদের দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

এদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসান আল মামুন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তো এদের নিয়ে আন্দোলন করি নাই। এরা কীভাবে এখানে এল? আমরা আগের কথাটাই বলতে চাই, আমাদের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা ছিলেন, তাঁরা উপাচার্যের বাসায় হামলা চালাননি।’

সুত্রঃ প্রথম আলো

কমেন্টস

কমেন্টস